সারাদেশ

অসহায়দের সহায় মনিরুজ্জামান

  তারাগঞ্জ(রংপুর)প্রতিনিধি 5 February 2021 , 2:51:57 প্রিন্ট সংস্করণ

বড় ঘর দেখেই ২৫ বছর আগে মঞ্জিলা বেগমের বিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। স্বামী মোন্নাফ হোসেনের সংসার তখন ভরভরন্তি। টিনের চকচকে বাড়ি, গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু সব মিলিয়ে মঞ্জিলা বেগমের সুখের সংসার ছিল। কিন্তু এখন সেই মঞ্জিলার সংসারে শুধুই হাহাকার। দু’মুঠো ভাতের জন্য পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে ভিক্ষা করেন তিনি। গত শুক্রবার মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এ,এ মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে তাকে কিনে দেওয়া হয়েছে গাভি-বাছুর।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামে মঞ্জিলা বেগমের বাড়ি। মঞ্জিলার বয়স ৪২ ছুঁই ছুঁই। একসময় তাঁর কোনো অভাব ছিল না। ছিল বাড়ি, আবাদি জমি আর শরীরের তাগত। আজ এসব নেই। স্বামীর ও নিজের চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব। শরীর কুলোয় না, ব্যথায় জর্জরিত দুহাত উঁচু করতে পারেন না। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেজো মেয়ে একাদশ ও ছেলে দশম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছেন। অসুস্থতার কারণে মঞ্জিলার স্বামী মোন্নাফ হোসেনের ১৫ বছর আগে বাঁ পা হাটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে।

মঞ্জিলার হাতে গাভি ও বাছুর তুলে দিচ্ছেন তারাগঞ্জ শিক্ষক সমিতির সভাপতি দুলাল হোসেন।

৬ বছর আগে মঞ্জিলা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হন। স্বামী এবং তাঁর চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহে খুয়েছেন বাড়ি, আবাদি জমি। জীবন সঙ্গী মোন্নাফ হোসেনকে নিয়ে ভিক্ষা করে এখন জীবিকা নির্বাহ করছেন। গত শুক্রবার তাঁর হাতে গাভি ও বাছুর তুলে দেওয়া হয়েছে। গাভি পেয়ে মঞ্জিলা বেগম বলেন, ‘বাবা তোমরা মোক গরু বাছুর দিয়া বাচাইনেন। মুই এ্যালা আর ভিক্ষ করিম না। তোমার গরুর দুধ বেচে পেট চালাইম। ঔষুধ কিনিও খাবার পাইম। নামাজ পড়ি আল্লার কাছোত দোয়াও করিম।’

রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জেবা নাসরিন বেহুলার হাতে গাভি ‍তুলে দিচ্ছেন।

কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বালারহাট গ্রামে বেহুলা বেগমের বাড়ি। স্বামী ছেড়ে গেছে ১৫ বছর আগে। এক শতক জমির ওপর ছোট একটা খুপড়ির ঘরে ১৫ বছর ধরে বসবাস করছেন তিনি। তাঁর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে আর এক ছেলে পড়াশোনা করছেন। মানুষের বাড়িতে কাজ করে চলছিলেন বেহুলা বেগম। বছরখানেক ধরে চোখে ঝাপসা দেখেন বলে এখন আর কেউ তাঁকে কাজে নেন না। দয়া করে কেউ কাজ দিলে ভাত জুটে, নাহলে অনাহারে দিন কাটে। এই বেহুলা বেগমকে ৫ ফেব্রুয়ারি মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা তারাগঞ্জ থেকে মাইক্রোযোগে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দুধেল গাভি-বাছুর দেন।

গাভি হাতে পেয়ে বেহুলে বেগমের চোখ গড়িয়ে পানি পড়ে। শাড়ির আচলে সেই পানি মুচতে মুচতে বলেন, ‘মেলা দিন আগোত স্বামী ছাড়ি চলি গেইছে। আগোত মাইনসের বাড়িত কাজ করতাম। বয়স বেশি হইছে। কাজ করতে কষ্ট হয়। ভাড়ি কাজ কইরবার পারি না। তোমরা মোক বাড়িত আসি গরু-বাছুর দিলেন। মুই খুব খুশি হছুন। বাপু তোমার কথা মুই মরলেও ভুলিম না। গরুর দুধ বেচে চলি ফিরি খাইম।’

কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জিলুফা সুলতানার সঙ্গে সংগঠনের সদস্যরা।

বেহুলাকে গাভি হস্তান্তরের খবর পেয়ে মানব কল্যাণ ঘর সংগঠনের সদস্যদের নিজ কোয়াটারে ডেকে নেন কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এক ঘন্টায় আড়াই লাখ গাছের চারা রোপণ করে জাতীয় পুরুষ্কার প্রাপ্ত) তারাগঞ্জের সাবেক ইউএনও জিলুফা সুলতানা । তিনি সংগঠনের সদস্যদের নিজ হাতে আপ্যায়ন করেন। ফেরার সময় সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমাদের কর্মকান্ডে আমি মুগ্ধ। ইচ্ছা থাকলেও আমরা অনেক কিছু করতে পারি না। তোমরা সমাজের দর্পণ, দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তোমাদের প্রত্যেককে ভালো মানুষ হিসেবে তৈরি হতে হবে। এমন কাজ করতে হবে মরেও যেন মানুষ তোমাদের সংগঠনের নাম মনে রাখে।’

তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের শেখপাড়া গ্রামের মঞ্জুয়ারা বেগমের বয়স ৪৫ কোটায়। তাঁর স্বামী অসুস্থ্য, কাজ করতে পারেন না। মঞ্জুয়ারা এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করে সংসার চালান। কাজ পেলে খাবার জুটে না হলে অনাহারে দিন কাটে। তাঁর ওপর মঞ্জুয়ারা মা মনোয়ারা বেগম আশ্রয় নিয়েছেন তাঁর সংসারে। মঞ্জুয়ারার সহায় সম্বল বলতে দুই শতক জমির ওপর নির্মাণ করা ভাঙা টিনের ছোট একটা ঘর।

সংগঠনের হিসাব রক্ষক আসাদুজ্জামান গাভি ও বাছুর তুলে দিচ্ছেন মঞ্জুয়ারার হাতে ।

মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে কেনা দুধেল গাভি-বাছুর ১০ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুয়ারা ও তাঁর মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা মঞ্জুয়ারার বাড়িতে গিয়ে ওই গাভি ও বাছুর তুলে দেন। এ সময় মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘মুই তো বিশ্বাসই করিবার পাওছু না। এত্তুলা টাকা গরু বাছুর হামাক মাগনা(ফ্রি) দিনেন। হামার কষ্ট এত্তদিন কায়ও বোঝে নাই। আল্লায় তোমাক পাঠাইছে হামার কষ্ট দূর কইরবার।’

বদরগঞ্জ উপজেলার কাচাবাড়ি গ্রামের রাহেনা বেগমের সহায় সম্বল বলতে স্বামীর রেখে যাওয়া দুই শতক জমির ওপর মাটির পুরোনো একটা ঘর। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক ছেলে থাকলেও তাঁর সংসারে নুন আন্তে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তাই পেট চালাতে এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করতে হয় তাকে। ১০ ফেব্রুয়ারি মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা তাঁর হাতে গাভি তুলে দেন। উচ্ছূসিত রাহেনা বেগম বলেন, ‘মানব কল্যাণ ঘর মোর জেবোনের অংশ। গাভি পাছুন, বাছুর পাছুন। এর চেয়া আর বড় খুশি কি আছে? এখন মোর কষ্ট থাকির নেয়, শান্তিতে বাঁচিম। নামাজোত যায় গাভি দিলে তাঁর জন্যে দোয়া করিম।’

সংগঠনের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক জেমিন শেখ গাভি ও বাছুর তুলে দিচ্ছেন রাহেনা বেগমের হাতে ।

প্রফেসরপাড়া গ্রামের এন্দা মিয়া পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। ভ্যান চালিয়ে ভালোই চলছিল তাঁর ৬ সদস্যের সংসার। দুই বছর আগে সড়ক র্দুঘটনা তাকে কর্মহীন করে দেয়। রিকশা থেকে মহাসড়কে ছিটকে পড়ে তাঁর ডান পাঁ ভেঙে যায়। এর পর থেকে ভাড়ি কোনো কাজ করতে পারেন না। সংসারের হাল ধরেন স্ত্রীর মমো বেগম। সংসার চালাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন মমো। যে আয় হয় তা দিয়ে অতি কষ্টে চলছে ছয় সদস্যের সংসার। তাঁদের এই কষ্ট দেখে মানব কল্যাণ ঘরের সদস্যরা তাকে একটি গাভি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতিমধ্যে এ,এ মনিরুজ্জামান তাঁর জন্য গাভি কেনার টাকাও পাঠিয়েছে। এখন মানব কল্যাণ ঘরের সদস্যরা মমোর জন্য গাভি খুঁজছেন। গাভি পেলেই তাকে হস্তান্তর করা হবে।

দুই মেয়ে এক ছেলে আর স্ত্রী নিয়ে তারাগঞ্জ উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামের তালেব আলীর সংসার। কোনো জমি-জমা নেই। সহায় সম্বল বলতে দেড় শতক জমির ওপর তৈরি করা একটি টিনের ঘর। ভাড়া রিকশা চালিয়ে সংসার চালান তালেব আলী। এতে যা আয় হয় তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চলে না। তার ওপর দুই সন্তানের লেখাপড়া। এই তালেব আলীকে মনিরুজ্জামানের অর্থে কেনা একটি ব্যাটারী চালিত ভ্যান দেওয়া হয়েছে। নতুন ভ্যানের চাবি হাতে পেয়ে তালেব আলী বলেন, ‘তোমরা মোর খুব উপকার কর নেন বাহে। খুব কষ্টে আছনু। এ্যালা আল্লায় দেলে তোমার দেওয়া নয়া ভ্যানের কামাই দিয়া বউ বাচ্চাক নিয়ে সুখে থাকিম।’

রংপুর জেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ভ্যানের চাবি তুলে দিচ্ছেন তালেব আলীকে।

দুই বছর আগেও তারাগঞ্জ উপজেলার ছুট মেনানগর গ্রামের ভুট্টু মিয়ার সংসারে সুখ ছিল। স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে রিকশা চালিয়ে ভালোয় চলছিল সংসার। দুই শতক জমির ওপর একটি চকচকে টিনের ঘরও ছিল। বড় মেয়ে জেমি আক্তারের চিকিৎসা করতে গিয়ে রিকশা ভ্যানটি বিক্রি করে দেন। এরপর থাকার টিনের ঘরটি বিক্রি করে চিকিৎসা করেন। তারপর থেকে ভাড়ায় রিকশা চালাতেন তিনি। এতে তাঁর দু’মুঠো খাবার ঠিক মতো জুটতো না। এই ভুট্টু মিয়াকেও মানক কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে একটি ব্যাটারী চালিত ভ্যান দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশ গাইবান্ধা জেলার বিশেষ শাখার ডিআইও-১ আব্দুল লতিফ মিঞার নেতৃত্বে তারাগঞ্জের ছুট মেনানগর গ্রামের হতদরিদ্র ভুট্টু মিয়াকে ব্যাটারী চালিত ভ্যানের চাবি তুলে দিচ্ছেন মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা।

নতুন ভ্যানের চাবি হাতে পেয়ে হাউমাউ করে কেটে উঠেন ভুট্টু মিয়া ও তাঁর স্ত্রী। সংগঠনের সদস্যদের জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘খুব কষ্টে আছনু। মানুষের কাছে হাত পাততেও লজ্জা লাগে কি করবো বলেন- কেউ আমাকে সাহায্য দেয় না। আল্লাহর হুকুমে তোমরা ভ্যানটা দিলেন। এল্যা ছাওয়াগুলাক পড়ার খরচ দিতে কষ্ট হইবে না।’

রংপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সভাপতি শিপুল ইসলামের নেতৃত্বে তারাগঞ্জের উত্তর নারায়ণজন গ্রামের হতদরিদ্র রবিউল ইসলামকে ব্যাটারী চালিত ভ্যানের চাবি তুলে দিচ্ছেন সংগঠনের সদস্যরা।

উত্তর নারায়ণজন গ্রামের রবিউল ইসলাম থাকেন খুপড়ির ঘরে। পাঁচ সদস্যের সংসার। কোনো জায়গা জমি নেই। রংপুর শহরে ভাড়ায় রিকশা চালাতেন। এতে যা আয় হতো তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল তাকে। তাঁর ইচ্ছে ছিল টাকা জমিয়ে ভ্যান কিনবেন। একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছিলেন। কিন্তু করোনায় সেই জমানো টাকায় হাত দিতে হয় তাকে। ভ্যান কেনার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। শুক্রবার মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে কেনা ব্যাটারী চালিত ভ্যানের চাবি হাতে পেয়ে চোখ মুখ আনন্দে জ্বলজ্বল করছিল। ভ্যানের হাতল ধরে তিনি হাসি মুখে বলেন, ‘তোমরা মোর ভ্যান কিনার ইচ্ছা পূরণ করনেন ভাই। এ্যালা পরিবার নিয়া বাচোনের একটা ভালো পথ পানু। আল্লাহ তোমাকও শান্তিতে থুইক।’

সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য বর্ষা রানীর নেতৃত্বে তারাগঞ্জের বামনদীঘি গ্রামের হতদরিদ্র লেবু মিয়াকে ভ্যানের চাবি তুলে দিচ্ছেন সদস্যরা।

বামনদীঘি গ্রামের লেবু মিয়ার গল্পটি একটু ভিন্ন। তিনি ভূমিহীন ছিলেন না। ৫০ শতক জমি, টিনের বাড়ি ছিল। জমি চাষের আয় দিয়ে তাঁর সংসার চলতো। কিন্তু তাঁর দুঃসময় নেমে আসে মা বাচ্চাই বেওয়া অসুস্থ হওয়ার পর। তাঁর চিকিৎসা করাতে গিয়ে টিনের বাড়ি, আবাদি জমি বিক্রি করে দিতে হয়। ৬ বছর থেকে তিনি পরিবার সহ অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। রংপুর শহরে ভাড়ায় রিকশা চালিয়ে তাঁর সংসার চলছে। রিকশার চালালে জোটে ভাত, না হলে অনাহারে কাটে রাত। এই লেবু মিয়াকেও মনিরুজ্জামানের অর্থে কেনা একটি ব্যাটারী চালিত ভ্যান দেওয়া হয়েছে। নতুন ভ্যানের চাবি হাতে পেয়ে লেবু মিয়া বলেন, ‘তোমরা মোর বিপদের বন্ধু। তোমার কথা মুই সারা জীবন মনে থুইম। আল্লাহর কাছোত যায় ভ্যান দিলে তাঁর জন্যে সউগ সময় দোয়া করিম।’

রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য কুলসুম আক্তারের নেতৃত্বে তারাগঞ্জের ডাংগীরহাট গ্রামের হতদরিদ্র সোনা মিয়াকে ভ্যানের চাবি তুলে দিচ্ছেন সদস্যরা।

ডাংগীরহাট সরকারপাড়া গ্রামের সোনা মিয়ারও চোখে মুখে ক্লান্তি আর হতাশা ঝাঁপিয়ে এখন খুশির ঝিলিন। তিনিও একটি ব্যাটারী চালিত ভ্যান পেয়েছেন। সোনা মিয়া বলেন, ‘মোর তো খুব কষ্ট। জমি জায়গাও নাই। হামার এলাকা তেমন কাজ কামও পাওয়া যায় না। বাপ-মাও, বউ ছাওয়াক তিন বেলা খাবারে দিবার পাও না। মোর কান্দোন আল্লাহ শুনছে। তোমার এই ভ্যান কোনা পায়া মুই খুব খুশি হনু। ভ্যান চালে কামাই করি বাপ-মাওয়ের ওষুধ কিনিম, ছাওয়াগুলাক স্কুল খরচ দেইম। আল্লায় দেলে এই ভ্যান কোনো দিয়া মোর ভালোয় দিন যাইবে। মোক কামের তকনে আর বসি থাকির নাগবে না।’

গাভি ও ভ্যান বিতরণ উপলক্ষ্যে ইকরচালী উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সভাপতি শিপুল ইসলাম বলেন, মনিরুজ্জামান স্যারের পক্ষ থেকে আমি সংগঠনের সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জানাই। আপনারাই অনেক কষ্ট করে এসব দরিদ্র মানুষের খোঁজ দিয়েছেন। আপনাদের সহযোগিতায় সংগঠনের সকল কার্যক্রম চলছে। আমরা আমাদের প্রাণের সংগঠন মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে এর আগে মনিরুজ্জামান স্যারের অর্থায়নের ৭টি পরিবারকে ঘর তৈরি করে দিয়েছি। খাবার কম্বল বিতরণ করাও হয়েছে। আজকে ব্যাটারী চালিত ভ্যান ও গাভি হস্তান্তর করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমরা সুযোগ পেলে আরও ঘর ও গাভি দিব। অসহায় দরিদ্র পরিবারের প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতাও করব।’

মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের হিসাব রক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করা। আর এই কাজগুলো করতে পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা করছেন রহিদুল ভাই। আমাদের দেখাদেখি যদি আর পাঁচজন মানুষ ভালো কাজ করার শপথ নেন তাহলে আমাদের এ কাজ সার্থক হবে।

গাইবান্ধা জেলার পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইও-১ ওসি আব্দুল লতিফ মিয়া বলেন, রহিদুল ভাইয়ের কাছে এতদিন মনিরুজ্জামান সাহেবের গল্প শুনেছি। আজ বাস্তবে তাঁর কর্মকান্ড দেখলাম। তিনি পরোপকারী মানুষ। ঘর তৈরি, ভ্যান ও দুধেল গাভি দান করার এই উদ্যোগে ব্যতিক্রম। এই উদ্যোগের ফলে হতদরিদ্র পরিবারগুলো ঘুরে দাড়ানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সবার কিছু করার দরকার।

রংপুরের জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তোমাদের সংগঠনের প্রত্যেক সদস্যকে রহিদুল-মনিরুজ্জামান সাহেবের মতোই ভালো মানুষ হতে হবে। প্রকৃত অসহায়দের পাশে সব সময় দাঁড়াতে হবে। অন্যরা যদি তোমাদের এ কাজ অনুসরণ করেন, তাহলে সেটা হবে সমাজের মানুষ, বিশেষ করে দারিদ্র মানুষের একটা ভরসার জায়গা।

গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার পুলিশের উপপরিদর্শক ও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য জয়ন্ত রায় বলেন, ‘আমার বাবা অসুস্থ। মায়ের আয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলতো। ভাঙা একটা ঘরে ঘুমাতে হয়েছে। রহিদুল আংকেল ও মনিরুজ্জামান স্যারের মতো পরোপকারী মানুষের সহায়তায় লেখাপড়া করে পুলিশের উপপরির্দশক হয়েছি। আজ মনিরুজ্জামান স্যারের টাকায় কেনা ভ্যান-দুধেল গাভি আমার মতো হতদরিদ্র পরিবারের হাতে তুলে দিতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। ভ্যান ও গাভি পাওয়া মানুষের মুখের হাসি আজ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমিও অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করব।’

সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য বর্ষা রানী বলেন, আমি তো মায়ের সাথে মানুষের খেতে কাজ করতাম। মনিরুজ্জামান স্যারের মতো লোকদের সহযোগিতায় পড়াশোনা করে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি। ‘মানব কল্যাণ ঘর’ সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে আমি ভালো কাজে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছি। আগামীতে এ সংগঠন মাধ্যমে গাভি ও ঘর তৈরির উদ্যোগ নিলে আমিও বেতনের একটা অংশ ওই তহবিলে দিব।’

তারাগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি দুলাল হোসেন বলেন, ‘আমি মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রম স্বচোখে দেখেছি। এই সংগঠন মনিরুজ্জামান সাহেবের সহায়তায় দরিদ্র মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য আমি নিজেও এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।’

ইকরচালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, মনিরুজ্জামান সাহেব কষ্টে থাকা দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে দৃষ্টান্ত রেখেছে, তা প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয়। আমরা এর থেকে মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এই বোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হই।’

আরও খবর

Sponsered content

error: ছি ! ছি !! কপি করার চেষ্টা করবেন না ।