কুড়িগ্রাম

আগামীকাল ১৩ নভেম্বর বর্বরোচিত হাতিয়া গন-হত্যা দিবস

  আব্দুল মালেক, উলিপুর(কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধিঃ 12 November 2022 , 10:04:07 প্রিন্ট সংস্করণ

আগামীকাল রোববার ১৩ নভেম্বর বর্বরোচিত ‘‘হাতিয়া গন-হত্যা দিবস”। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক-হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-সাম্স বাহিনীর সহযোগীতায় নিরীহ ৬’শ ৯৭ জন গ্রামবাসিকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পূর্ব দিকে ব্রহ্মপূত্র নদ বেষ্ঠিত উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের দাগারকুটি গ্রামের ঘুমন্ত এসব নিরীহ মানুষকে ধরে এনে পাকিস্তানী হায়েনারা নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে জঘন্যতম নারকীয় এ হত্যাকান্ডের ইতিহাস জাতীয় পর্যায়ে তেমন গুরুত্ব না পেলেও উলিপুরে মানুুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। আজও নিহত শহীদদের স্বজনরা খুঁজে ফিরে তাদের আপনজনকে। দাগারকুটি গ্রামটিকে ঘিরে স্মৃতিসৌধ নির্মান করে এলাকার মানুষজন প্রতি বছর শহীদদের স্মরণ করে আসছিল। কিন্তু করালগ্রাসী ব্রহ্মপূত্র নদ দাগারকুটি গ্রামটিই তার বুকে ধারন করে নিয়েছে। বর্তমানে অনন্তপুর বাজারের পশ্চিম দিকে নতুন করে স্মৃতিসৌধ নির্মান করে দিবসটি প্রতি বছর পালন করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে স্বাধীনতা যুদ্ধের এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ হয়তো মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যাবে, কিন্তু শহীদের স্বজনরা তাদের আপনজনদের স্মরণ করবেন সারাজীবন নিরবে-নিভৃতে। গন-হত্যার শিকার শহীদ পরিবার গুলোর দাবী হাতিয়া দিবস জাতীয় পর্যায়ে যথাযোগ্য মর্যদায় পালন সহ ক্ষতিগ্রস্থ শহীদ পরিবার গুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পূনর্বাসন করা হউক।
১৯৭১ সালের সেই নারকীয় রক্তঝরা দিনটি ছিল ২৩ রমজান, শনিবার। গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষ সেহরীর খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিশ্চিছিল। এরই মধ্যে ফজরের নামাজের আযান ধ্বনিত হচ্ছে মসজিদে মসজিদে। নামাজের প্রস্তুতি নিতে অজুও সেরে ফেলেছেন অনেকে। হঠাৎ পাকিস্তানী হায়েনার মর্টার সেল আর বন্দুকের অবিরাম গুলি বর্ষনে প্রকম্পিত হয়ে দাগারকুটি গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলো। মানুষজন কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকিস্তানী হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-সাম্স বাহিনী মিলে নিরীহ গ্রামের বাড়ী-ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এর সাথে চলতে থাকে লুটপাঠ ও নির্যাতন। আকর্ষ্মিক এ পরিস্থিতিতে এলাকার নিরীহ মানুষজন উ™£ান্তের মতো এলোপাথাড়ী ছোটাছুটি শুরু করেন। পাকিস্তানী বাহিনীর ছোঁড়া বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষনে মানুষজন জীবন বাঁচতে পার্শ্ববর্তী ধান ক্ষেতসহ ঝোঁপ-জঙ্গলে শুয়ে জীবন বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। অনেকে ব্রহ্মপূত্র নদে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অসহায় বৃদ্ধ আর শিশুদের আর্তচিৎকারে এলাকার আকাশ-বাতাশ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠে। এসব অসহায় গ্রামবাসীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা মহুর্তেই শেষ হয়ে যায়। পাক-হানাদার বাহিনী, তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-সাম্স বাহিনীর সহযোগীতায় আত্মগোপন করা মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে এসে দাগারকুটিতে জড়ো করে হাত-পা বেঁধে নির্দয় ভাবে গুলি করে হত্যা করে। তাদের এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ থেকে সেদিন বৃদ্ধ ও মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিও রক্ষা পায়নি। দিনব্যাপী চলে পাক-হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ। আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়, হাতিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর, দাগারকুটি, হাতিয়া বকসি, রামখানা ও নয়াদাড়া গ্রামের শত শত ঘর-বাড়ী। মহুর্তেই গ্রামগুলো পরিনত হয় ধ্বংস স্তুপে। সেগুলো আজ শুধুই স্মৃতি।
বয়সের ভাবে ন্যুয়ে পরা স্বামী হারানো কচভান বেওয়া (৯০) এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বাবা ওরা স্বামীকে গুলি করি মারি ফেলাইছে। স্বামীর কথা মনোত উঠলে কিছু ভালো লাগে না। এসব কথার এক পর্যায়ে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন।
একই কথা জানালেন জুলাপ বিবি (৮৫)। তিনি আরো বলেন, মই শুধু স্বামীকে হারাং নাই। তিন দেবর, শ্বশুরকেও হারাইছোং। ওরা কাকো বাইচপার দেয় নাই।
‘‘হাতিয়া গন-হত্যা দিবস” উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে পালন করবে। সকাল ৮টায় জাতীয় পতাকা ও কালো পতাকা অর্ধনমিতকরণ, শহীদ স্মৃতিস্থম্ভে পুষ্পার্ঘ অর্পণ। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শোভন রাংসার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকবেন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক এম এ মতিন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম হোসেন মন্টু, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাকেব কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা, সাবেক কমান্ডার এম ডি ফয়জার রহমান, হাতিয়া গন-হত্যা দিবস উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও হাতিয়া ইউপি’র প্যানেল চেয়ারম্যান রাজ্জাকুল ইসলাম প্রমূখ। শেষে দোয়া অনষ্ঠিত হবে।
এদিকে এম এ মতিন কারিগরি ও কৃষি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খোরশেদ আলমের আহবানে, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর আয়োজনে সন্ধ্যা ৬টায় উলিপুর বণিক সমিতির কার্যালয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, অধ্যাপক এম এ মতিন এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউএনও, উলিপুর থানা অফিসার ইনচার্জ শেখ আশরাফুজ্জামান। বক্তব্য রাখবেন, সাবেক কমান্ডার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা প্রমূখ। সভায় গণহত্যার উপর গবেষণাপত্র উপস্থাপন করবেন, ইতিহাস গবেষক আবু হেনা মুস্তফা।

আরও খবর

Sponsered content

error: ছি ! ছি !! কপি করার চেষ্টা করবেন না ।