সারাদেশ

নয়া ঘরের মালিক হইম স্বপ্নেও ভাবো নাই

  তারাগঞ্জ(রংপুর)প্রতিনিধি: 13 January 2021 , 12:20:46 প্রিন্ট সংস্করণ

পোদ্দারপাড়া গ্রামের রওশন আরার বয়স ৬০ বছরের কাছাকাছি। কানে কম শোনেন, দৃস্টি শক্তিও ঝাপশা। চলেন লাঠিতে ভর দিয়ে। তার প্রতি কারও দয়া হলে খাবার জুটে, না হলে অনাহারে দিন কাটে। অসুস্থ্যর কারণে চার বছর আগে তাঁর বাঁ পা হাটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়। থাকার একমাত্র ঘরটি বিক্রি করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামী ছয়মুদ্দিনের চিকিৎসা করলেও এক বছর আগে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। অসহায় হয়ে পড়েন রওশন আরা। এক পাঁয়ে ভর দিয়ে এবাড়ি ও বাড়ি ভিক্ষা করে পেটের খাবার জোগালেও তাঁর থাকার কোনো ঘর ছিল না।

নতুন ঘরের সামনে প্রতিবন্ধি রওশন আরা

তাঁর ঠাঁই হয়েছিল পোদ্দারপাড়া গ্রামের মজিবর রহমানের গোয়াল ঘরের বারান্দায়। খেয়ে না খেয়ে সেখানেই দিন কাটাতেন রওশন আরা। শীর্তাতদের কম্বলের তালিকা করতে গিয়ে রওশন আরার এমন করুণ অবস্থার কথা জানতে পারেন মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা। খবর চলে যায় মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উপদেষ্টা ঢাকা বানানীর বাসিন্দা এ,এ মনিরুজ্জামানের কাছে। অবশেষে তাঁর অর্থায়নে একটি থাকার ঘর পেয়েছেন রওশন আরা। সঙ্গে একটি চৌকি, তোশক, চাদর, মশারিও তাঁকে দেওয়া হয়েছে।

পোদ্দারপাড়া গ্রামের প্রতিবন্ধি রওশন আরাকে নতুন ঘরের চাবি হাতে তুলে দিচ্ছেন “মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের সভাপতি শিপুল ইসলাম ও সদস্যরা

শুধু রওশোন আরা নয়, তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের মালতি রানী সরকার, হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের নদীরপাড় গ্রামের আলেমা বেগম, ইকরচালী গ্রামের সাজিদা বেগম, জগদীশপুর গ্রামের আর্জিনা বেগম, মেনানগর গ্রামের বাচ্চানী বেগম, ফকিরপাড়া গ্রামের জোনাব আলীকেও মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে আধা পাকা টিনের ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে জগদীশপুর গ্রামের আর্জিনা বেগমের ঘর তৈরি কাজ করা চলছে

উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে পোদ্দারপাড়া গ্রামের রওশন আরার বাড়ি। সহায় সম্বল কিছুই নেই। দিনমজুর স্বামী ছয়মুদ্দিন অন্যের বাড়ি কাজ করে যে আয় করত তা দিয়ে অতি কষ্টে চলতো রওশন আরার সংসার। রওশন আরা মেয়ে সাবিয়া খাতুনের বয়স যখন ৪বছর তখন অসুস্থতার কারণে তাঁর একটি পা হাটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়। তিন বছর আগে স্বামী ছয়মুদ্দিন পক্ষাঘতগ্রস্ত হলে তাঁর চিকিৎসা করতে গিয়ে এক সময় থাকার ঘরটিও বিক্রি করতে হয়। এরপর থেকে খেয়ে না খেয়ে অন্যের গোয়াল ঘরের বারান্দায় রাত্রী যাপন করতেন রওশন আরা আর তাঁর মেয়ে।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে ঘরের ওয়ালে পানি দিচ্ছেন সংগঠনের সদস্যরা

এই রওশন আরাকে মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে তৈরি করা নতুন ঘরের চাবি গতকাল বুধবার মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সভাপতি শিপুল ইসলামের নেতৃত্বে সদস্যরা তাঁর হাতে তুলে দেন। নতুন আধা পাকা টিনের ঘরের সামনে রওশন আরা বেগমের চোখের কোণে চিকচিক করছে পানি। আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। চোখের কোণে জমে থাকা পানি টুপ করে পড়ে। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে নিজেকে কিছুটা সামলিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘মুই তো মনিরুজ্জামান স্যারোক দ্যাখো নাই। স্যারও মোক চেনে না।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে মালিতী রানীর ঘর তৈরির সময়

তোমার মুখে স্যারের কথা শুনি মনে হওচে স্যার হামার মতোন গরিব মাইনসোক খুব ভালোবাসে। স্বামীর চিকিৎসার করবার যেয়া থাকার ঘরটা বেচে দিবার নাগছে। এক বছর থাকি মাইনসের বাড়ির বারান্দাত আছনু। মোর কষ্টের কথা শুনি স্যার মোক নয়া আধা পাকা টিনে ঘর তুলি দেছে। মুই নয়া ঘরের মালিক হইম স্বপ্নেও ভাবো নাই। আল্লাহ স্যারের মঙ্গল করুক, ছাওয়া ছোট নিয়া সুখী হউক। মেলা দিন আল্লাহ স্যারোক বাচে থুউক। হামার মতোন মানুসের উপকার করুক। স্যার মোক ঘর বানে না দিলে সারা জীবন মাইনসে গোয়াল ঘরোত ছাওয়াটা নিয়া থাকিবার নাগিল হয়।’

এই খুপড়ি ঘরে এক সময় দিন কাটাতেন নদীরপাড় গ্রামের আলেমা বেগম

হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনেশ্বরী নদীর ধার ঘেষে গড়া উঠা নদীরপার গ্রামের নদীর ধারে খুপড়ি ঘরে থাকেন আলেমা বেগম। বয়স ৬৭ বছর। স্বামী সুলতান হোসেন মারা গেছেন ৭ বছর আগে। মেয়ে সুলতানাকে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর বাড়িতে তাঁর ঠাঁই হয়নি। মা মেয়ে এক সঙ্গে থাকতেন খুপড়ি ঘরে। আলেমা কাজ করতে পারেন না। তিন ছেলে থাকলেও তাঁরা আলেমাকে দেখেন না। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়ে সুলতানা সংসার চালান টেনেটুনে। ঘর তোলার সামর্থ্য ছিল না।

নতুন ঘরের সামনে নদীরপাড় গ্রামের আলেমা বেগম

মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তাকে আধা পাকা টিনের ঘর, চালা, শৌচাগার নিমার্ণ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার সেই ঘরের চাবি আলেমা বেগমের হাতে তুলে দেন মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জেবা নাসরিন।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে ঘরের চাবি আলেমার হাতে তুলে দিচ্ছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জেবা নাসরিন সহ সদস্যরা

নুতন চাবি হাতে নিয়ে আলেমা বেগম মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘মোর ছেলেরা বউ ছাওয়া নিয়া আলাদা থাকে। ওরা মোক দেখে না। স্বামীও মরি গেইছে। বেড়ার বাড়িত জারত কষ্টে আছনু। কায়ও মোর কষ্ট বোঝে নাই। তোমরায় মোর কষ্ট বুঝি মনিরুজ্জামান স্যারের টাকায় মোক ঘর বানে দিলেন। তোমরা স্যারোক কন মুই যদ্দিন বাচিম তদ্দিন নামাজ পড়ি স্যারের জন্য আল্লাহর কাছোত দোয়া করিম।

ভাঙা পচা খড়ের ছাউনি দেওয়া এই কুড়ে ঘরে এক সময় দিন যাপন করছেন জোনাব আলী

ফকিরপাড়া গ্রামের জোনাব আলীর বয়স ৭৭ বছর পেরিয়েছে। চোখে ঝাপসা দেখেন। চলেন লাঠিতে ভর দিয়ে। নেই কোনো সহায় সম্পদ। স্ত্রী লাবিনা বেগম এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করেন। কাজ পেলে খাবার জোটে না পেলে অনাহারে দিন জোটে। তাঁর এক ছেলে থাকলেও তার নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। ভাঙা কুঁড়ে ঘরে কষ্টে জীবন যাপন করতেন। তাকেও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে আধা পাকা টিনের ঘর, চালা, শৌচাগার নিমার্ণ করে দেওয়া হয়েছে।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করে দেওয়া নতুন ঘরের সামনে জোনাব আলী

গত মঙ্গলবার মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মনিরুজ্জামান রোজের নেতৃত্বে মানব কল্যাণ ঘরের সদস্যরা তাঁঁর হাতে চাবি তুলে দেন। নতুন ঘরের চাবি হাতে পেয়ে জোনাব আলী দু’হাত তুলে দোয়া করে বলেন, ‘মুই তো চলবারে পাও না। বউয়ে যা আনে তাকে খাও। ভাঙা খড়ের ঘরোত এদ্দিন আছনু। দ্যাওয়ার পানি আসলে অন্যের বাড়িত বারান্দাত যেয়্যা আছনো। আল্লায় দিছে এ্যালা নিজের ঘর হইল, পায়খানা(শৌচাগার), বারান্দা হইল। নিন পাইরার তকনে চকি, তোষোপও পানু। এ্যালা আর মোর কোনো কষ্ট হইবে না। শান্তিতে ঘুমবার পাইম। তোমরা মোক ঘর বানে দিয়া বাপের কাম করনেন। তোমার এই ঋণ মুই কোনো দিন ভুলিম না।’

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘরের চাবি জোনাব আলীর হাতে তুলে দিচ্ছেন সিভিন ইঞ্জিনিয়ার মনিরুজ্জামান রোজ

মেনানগর গ্রামের বাচ্চানী বেগমের অবস্থা আরও করুণ। তাঁর দুই সন্তান থাকলেও নিজে ভাত পান না। দিনমজুর ছেলে বাদশা মিয়া যা আয় করেন তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চলে না। বাচ্চানী বেগমও গ্রামের এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করেন। নতুন ঘর তোলার সামর্থ্য তাদের ছিল না। ভাঙা টিনের চালায় কষ্টে দিনাতিপাত করতেন। তাকেও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে একটি আধা পাকা টিনের ঘর, চালা ও শৌচাগার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

ভাঙা বাঁশের বেড়া আর পুরোনো টিনের ছিদ্র চালায় এক সময় দিন কাটাতেন বাচ্চানী বেগম

গত মঙ্গলবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেনের নেতেৃত্ব মানব কল্যাণ ঘরের সদস্যরা ঘরের চাবি তুলে দেন। সেই ঘরের চাবি হাতে পেয়ে বাচ্চানী বেগম মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘বাবা মোর তো কষ্টের শ্যাষ আছলো না। ঝড় বৃষ্টি আসলে ঘুমবার পাছনো না। টিনের ফুটা দিয়া ঘরোত পানি ঢুকছেলো। শীতের দিনে হু হু করি ঠান্ডা বাতাস টাটির(বেড়া) ভাঙা দিয়ে ঘরোত ঢুকছেলো। ছোট দুইটা নাতী নিয়া কষ্টে আছনু।

নতুন ঘরের সামনে বাচ্চানী বেগম

এ জীবনে নয়া ঘরোত ঘুমাইম স্বপ্নেও ভাবোও নাই। মনিরুজ্জামান স্যার তাক পূরণ করিল। স্যারোক আল্লাহ নেক হায়াত দান করুক। স্যার ছাওয়া ছোট নিয়া সুখী হউক। স্যার মোক বাড়ি বানে না দিলে সারা জীবন ভাঙা চালাত থাকিবার নাগিল হয়। এ্যালা নিজের ঘরোত শান্তিতে ঘুমাইম। স্যারের জন্য দোয়া করিম।’ ইকরচালী গ্রামের স্বামীহারা সাজিদা বেগমের (৫২) চোখেমুখেও আনন্দের ঝিলিক। তিনিও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠেনের উদ্যোগে মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে নতুন আধাপাকা ঘর, বারান্দা, শৌচাগার পেয়েছেন।

 

জরাজীর্ণ এই ঘরে দিন কাটত সাজিদা বেগমের

এক যুগ ধরে টিনের চালা ও বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি পুরোনো ভাঙা ঘরে থাকতেন তিনি। তাঁর সহায় সম্বল বলতে ছিল তিন শতক জমির ওপর নিমার্ণ করা ভাঙা টিনের ছোট একটি চালা। স্বামী মারা যাওয়ার পর এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করে খাবার জোগাতেন। কাজ পেলে খাবার জুটতো না হলে অনাহারে দিন কাটতো। তাঁর এক মেয়ে নাসরিন নাহার এবারে এসএসসি পরীক্ষার্থী। গত সোমবার ইকরচালী এতিমখানার শিশুদের নিয়ে দোয়া শেষে তাঁর হাতে ঘরের চাবি তুলে দেন ইকরচালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘরের পাশে সাজিদা বেগম

চাবি হাতে পেয়ে সাজিদা বেগম বলেন, ‘আগোত দ্যাওয়ার পানি আইলে মুই রাইতোত নিন পাইড়ার পাও নাই। ভাঙা দিয়্যা পানি ঢুকি গাও বিছনা ভিজি গেছলো। সারা রাইত চেতন আছনু। এ্যালা দ্যাওয়ার পানি আইলেও মোর কোনো চিন্তা নাই। নয়া ঘরোত থাকোং। এই ঘর কোনা না পাইলে এ জীবনে নয়া টিনের ঘরোত শুতি থাকার আশা মনোতে থাকি গেল হয়।’

এক সময় এই কুঁড়ে ঘরে রাত্রীযাপন করতে মালতী রানী ও তাঁর পরিবার

উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের পুতুল চন্দ্র সরকার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর ছেলে তাপস সরকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। আরেক মেয়ে পড়েন বড়গোলা ঘনিরামপুর উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে। তাঁর কোনো জমি জায়গা নেই। দুই শতক জমি আর ছোট একটা মাটির কুঁড়ে ঘুর ছিল একমাত্র সম্বল। ঝড় বৃষ্টি এলে খুব কষ্ট হতো তাদের। সংসারের খরচ ও দুই সন্তানের লেখাপড়া চলতো তাঁর রিকশা চালানো আয়ে।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে মালতী রানী ও তাঁর স্বামী

চার বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনা তাকে কর্মহীন করে দেয়। রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে আহত হন। মেরুদন্ডে আঘাত পান। এরপর থেকে ভাড়ি কোনো কাজ করতে পারেন না। সংসারের হাল ধরে স্ত্রী মালতী রানী। দুই সন্তানের লেখাপড়া খরচ ও সংসার চালাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন মালতী রানী। যে আয় হতো তা দিয়ে কষ্টে চলতো সংসার। অর্থের অভাবে ঘর তুলতে না পেরে মাটির কুঁড়ে ঘরে থাকতেন তাঁরা। তাদের এ কষ্ট দেখে মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে মনিরুজ্জামানের অর্থায়নে একটি নতুন আধা পাকা টিনের ঘর, বারান্দা ও শৌচাগার নির্মাণ করে দেওয়া হয়।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘরের চাবি মালতীর হাতে তুলে দিচ্ছেন তারাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি দুলাল হোসেন

গতকাল বুধবার তারাগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি দুলাল হোসেনের নেতৃত্বে মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা তাঁঁর হাতে ঘরের চাবি তুলে দেন। ঘর পেয়ে খুব খুশি মালতী রানীর পরিবার। নতুন ঘরের চাবি হাতে পেয়ে মালতী রানী বলেন, ‘যখন স্বামীর বাড়িত আলছুং তকনো ভাঙা ঘর। বাবা মাটির দেওয়াল আর খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরোত ছাওয়া ছোট নিয়া খুব কষ্টে আছনু। টাকা আবানে ঘরের পচা খড় পাল্টার পারোং নাই। ঝড়ি আসলে দড়দড় করি পানি পড়ছিল। খুব কষ্টে আছনুং। তোমার ঘর কোনা পায়া খুব খুশি হছুন বাহে। ভগবান তোমার ভাল করুক। মুই তোমার কাছোত সারা জীবন ঋণী থাকিম।’

এক সময় এই জরাজীর্ণ ঘরে রাত কাটাতেন জগদীশপুর গ্রামের আর্জিনা বেগম

জগদীশপুর গ্রামের আর্জিনা খাতুনের সহায় সম্বল বলতে বসতভিটের ৪ শতক জমি। তাঁর চার মেয়ে। অভাবের কারণে এক মেয়ে অন্যের বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে রেখেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এক মেয়ে কলেজে পড়ছেন। অসুস্থ স্বামী কোনো কাজ করতে পারেন না। খুব কষ্টে চলছে তাঁর সংসার। তার ওপর আর্জিনার মা ছালেহা বেগম এসে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁর সংসারে। দুইটি ঘর থাকলেও একটিতে থাকেন আর্জিনার মেয়ে মমতাজ বেগম আর তাঁর স্বামী। আরেকটিতে থাকেন আর্জিনা আর তাঁর স্বামী ও কলেজ পড়ুয়া মেয়ে।

নতুন ঘরের সামনে আর্জিনা বেগম

আর্জিনার মা ছালেহা বেগম থাকতেন ছোট একটি কুঁড়ে ঘরে। তাদের কষ্ট দেখে মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে একটি নতুন আধাপাকা টিনের ঘর, বারান্দা, শৌচাগার নিমার্ণ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার সেই ঘরের চাবি আর্জিনার হাতে তুলে দেন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য বর্ষা রানীর। নতুন ঘর পেয়ে আর্জিনা খাতুন বলেন, ‘বাবা এদ্দিন তো খুব কষ্টে আছনু। তোমার নয়া ঘরোত শান্তিতে ঘুমাইম।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘরের চাবি আর্জিনার হাতে তুলে দিচ্ছেন সরকারি উচচ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বর্ষা রানী

তারাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি দুলাল হোসেন বলেন, ‘মানব কল্যাণ ঘর সংগঠনের কর্মকাÐ দেশের আর দশটা সংগঠনের চেয়ে আলাদা। আমি বলতে পারি রংপুরের মধ্যে এটি মানুষের কল্যাণে কাজ করা সেরা সংগঠন। যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সংগঠন গঠন করা হয়েছে সেই মনিরুজ্জামান-রহিদুল সাহেবকে স্যালুট জানাই। তাদের নেতৃত্বে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে মানুষের কল্যাণে অসাধারণ কাজ করছে। অসহায়দের সহায়তা দিচ্ছে। সাতটি হতদরিদ্র পরিবাকে ঘর তুলে দিয়ে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই সংগঠনের কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আজ নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘর উদ্বোধন করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা শৌচাগার

ইকরচালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সত্যিই আজ আবাক লাগছে। ঘরের চাবি হস্তান্তরের সময় অসহায় ৭টি পরিবারের সদস্যদের মুখের হাসি আমাকে মুগ্ধ করেছে। এই কীর্তৃত্ব মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের। আজ থেকে এ সংগঠনের কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেকে আমি যুক্ত করলাম। এই সংগঠনের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য অঙ্গীকার করলাম। আশা করব মনিরুজ্জামান সাহেব এই সংগঠনের পাশে সব সময় থাকবে।’

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘর পরিদর্শন করছেন সংগঠনের সদস্যরা

মানব কল্যাণ ঘর সামাজি সংগঠনের সভাপতি শিপুল ইসলাম বলেন, ‘মানব সেবায় অতুলনীয় মনিরুজ্জামান স্যার। আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি। স্যারের সঙ্গে কাজ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। স্যার মেধাবীদের শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। শীতার্তদের দিয়েছে কম্বল, খুদার্তদের দিয়েছেন খাবার। নিতান্ত দরিদ্র ৭টি পরিবারকে ৬লাখ টাকা ব্যয়ে আমরা ঘর, বারান্দা, শৌচাগার, তৈরি করে দিয়েছি।

যারা ঘর পেয়েছেন তাদের মুখের হাসি আমাকে মুগ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। আর এ কাজগুলো করতে পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা করেছে রহিদুল ভাই। এরকম আরও অনেক ভালো কাজ করতে চাই। ভালো কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই। সুযোগ পেলে আরও কিছু অসহায় মানুষকে আমাদের সংগঠনের মাধ্যমে গাভি ও সেলাই মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘরের অবকাঠামো

সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের সদস্য বর্ষা রানী বলেন, ‘মুঠোফোনে মনিরুজ্জামান স্যারের সঙ্গে কথা বলার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাঁর সাঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে তিনি সত্যিই একজন মানব দরদী। সব সময় তিনি মানবিক কাজগুলো করতে ভালোবাসেন। তাঁর বুকের ভেতরে আছে অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয়। এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা প্রতিটি ঘরে এরকম বারান্দা দেওয়া হয়েছে

ইকরচালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘মানব কল্যাণ ঘর সংগঠনের কর্মকান্ড প্রশংসার দাবিদার ও অনুকরণীয়। শুনেছি ঢাকার মনিরুজ্জামান নামের এক ভদ্রলোকের সহযোগিতায় সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে। দুস্থ, গরিব মানুষকে কম্বল, খাবার ও ঘর তৈরি করে দিয়ে সংগঠনটি এলাকায় সুনাম কুঁড়িয়েছে। আশা করব ভবিষ্যতেও সংগঠনের সদস্যরা এ ধরণের মানবিক কাজ করা অব্যহত রাখবে।

“মানব কল্যাণ ঘর” সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে তৈরি করা ঘরের উপরের অংশ

জানতে চাইলে ইউএনও আমিনুল ইসলাম বলেন, মানব কল্যাণ ঘর সামাজিক সংগঠনের কর্মকাÐ আমি জেনেছি। এটি মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন। এ সংগঠনকে সাধ্য মোতাবেক সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।

 

 

আরও খবর

Sponsered content

error: ছি ! ছি !! কপি করার চেষ্টা করবেন না ।